
এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-
একুশ শতকের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ বিপর্যয় মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ শিকার। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, তীব্র নদী ও শব্দ দূষণ, ব্যাপক বন উজাড়, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির নীরব ঘাতক ই-বর্জ্যের পাহাড় আমাদের এই চেনা সুজলা-সুফলা দেশকে এক ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা এখন আর কেবলই কোনো সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা খাতার পাতার তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি আমাদের টিকে থাকার, আমাদের মৌলিক অধিকারের এবং আমাদের সার্বভৌমত্বের লড়াই। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, যার ফলে কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হতে পারে। আজ যদি আমরা পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় না হই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য এক বসবাসের অযোগ্য, মরুময়, প্লাবিত ও বিষাক্ত বাংলাদেশ রেখে যাব। দেশকে বাঁচাতে হলে এখনই রাষ্ট্র, সমাজ, গণমাধ্যম, করপোরেট খাত এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।বাংলাদেশ বর্তমানে এক বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থার গবেষণা এবং বৈশ্বিক বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ডোমেস্টিক ও বৈশ্বিক দূষিত বায়ুর দেশ এবং শহরের তালিকায় বাংলাদেশ ও এর রাজধানী ঢাকা প্রতিনিয়ত শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এই বায়ু দূষণের মূল কারণ হলো ইটভাটার অনিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের নির্গমন, কলকারখানার বিষাক্ত গ্যাস এবং চারপাশের অপরিকল্পিত ও উন্মুক্ত নির্মাণকাজের ধূলিকণা। এই বিষাক্ত বাতাস গ্রহণের ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাজমা ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক ব্যাধি মহামারী আকার ধারণ করছে। একই সাথে দেশের পানির উৎসগুলো, বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী এখন শিল্পবর্জ্য, ডাইং কারখানার কেমিক্যাল, ভারী ধাতু যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম এবং প্লাস্টিকের স্তূপে পরিণত হয়ে কার্যত মৃত নদীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই নদীর পানি শুধু পানের অযোগ্যই নয়, বরং তা চাষাবাদ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্যও সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীও আজ নানা মুখী দূষণ ও মাটির ক্ষয়ের কারণে হুমকির মুখে। অন্যদিকে দেশের ফুসফুস খ্যাত সুন্দরবন এবং পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল প্রতিনিয়ত গাছ কাটা, পাহাড় কাটা এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের কারণে সংকুচিত হচ্ছে। বনের আয়তন কমে যাওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ শত শত প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও ভেষজ উদ্ভিদ, যা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে প্লাস্টিক ও পলিথিনের অভিশাপ; প্রতিদিন দেশে উৎপাদিত হওয়া হাজার হাজার টন ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ড্রেনেজ সিস্টেমে জটলা পাকিয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি করছে এবং মাটিতে মিশে গিয়ে মাটির উর্বরতা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে স্থায়ীভাবে দূষিত করছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দ দূষণ এবং কম্পিউটার, মোবাইল ও ব্যাটারির মতো ইলেকট্রনিক্স পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত ই-বর্জ্য, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে এক চরম uncertainty বা অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত আইনে পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট, আধুনিক ও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই আইনগুলোর যথাযথ, নিরপেক্ষ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রয়োগের অভাবেই পরিবেশের ক্ষতি দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবেশ সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও মৌলিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-তে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলভূমি , বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন। অর্থাৎ, পরিবেশ রক্ষা করা কেবল সরকারের কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক ও মৌলিক দায়িত্ব। এর পাশাপাশি দেশের পরিবেশ সুরক্ষার মূল আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ যা ২০১০ সালে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনের জন্য যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সাময়িকভাবে স্থগিত বা বিশেষ নির্দেশনা জারির ব্যাপক ও একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ধারা ৬(ক) মোতাবেক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী যেমন পলিথিন ব্যাগ বা নির্দিষ্ট ক্ষতিকর প্লাস্টিক উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ ও বিপণনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের স্পষ্ট ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ধারা ১২ অনুযায়ী যেকোনো নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা প্রকল্প পরিচালনার পূর্বে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বা ইআইএ সম্পন্ন করে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা বর্তমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩-এর মাধ্যমে আরও সুনির্দিষ্ট ও কঠোর করা হয়েছে। পরিবেশ সংক্রান্ত এই অপরাধগুলোর দ্রুত ও বিশেষায়িত বিচারের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০। এই আইনের অধীনে প্রতিটি জেলায় পরিবেশ আদালত বা স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গঠনের বিধান রয়েছে, যেখানে দূষণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রকার মামলা দায়ের এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী লাখ টাকা জরিমানা ও দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও দেশে রয়েছে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩, যা অনুযায়ী কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লোকালয়ের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন, ২০১৭ এবং পানি আইন, ২০১৩ এর মতো বিশেষ আইনগুলো দেশের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান ও পানি সম্পদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নিজস্ব প্রতিশ্রুতি বা ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস বাস্তবায়নে আইনি ও নীতিগতভাবে দায়বদ্ধ। পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব সুরক্ষিত করতে সবচেয়ে বড় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে আইনের কঠোর ও বৈষম্যহীন বাস্তবায়ন—সবক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কঠোর অভিভাবকসুলভ ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। আইন কেবল সরকারি গেজেট বা খাতার পাতায় বন্দী থাকলে চলবে না, পরিবেশ দূষণকারী বড় বড় শিল্পকারখানা, ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগার ২৪ ঘণ্টা চালু না রাখা প্রতিষ্ঠান এবং অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা ও করাতকলগুলোর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ মহাপরিকল্পনা ‘ ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ এবং শতবর্ষী ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ বা বদ্বীপ পরিকল্পনার দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন কয়লা, পেট্রোল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ এবং পরিবেশবান্ধব উৎসের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদনে ব্যাপক সরকারি ভর্তুকি, কর মওকুফ ও প্রণোদনা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন নীতিমালার আওতা আরও বাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ইকো-শিল্পায়নকে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। মহামান্য হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা লিগ্যাল পারসন হিসেবে বিবেচনা করে নদী দখলদার, বালি খেকো এবং নদীর তীরে বর্জ্য ফেলা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নগরায়ণের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা, খেলার মাঠ এবং প্রাকৃতিক জলাশয় বা লেক রাখার মাস্টারপ্ল্যান বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে ব্যাপকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন বা সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে এবং সুন্দরবন রক্ষায় বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে, পরিবেশ সচেতনতাকে একটি জাতীয় অভ্যাসে পরিণত করতে দেশের প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যক্রমে পরিবেশ সচেতনতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাছ লাগানোর গুরুত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাস্তবমুখী উদাহরণের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা উচিত। একটি দেশের পরিবেশ আন্দোলনে ও শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনয়নে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো। ক্ষমতার চর্তুথ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করতে পারে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের (Investigative Journalism) মাধ্যমেই নদী দখলকারী প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, পাহাড় কাটার মূল হোতা এবং অবৈধ পলিথিন কারখানার গোপন আস্তানাগুলো জনসাধারণের সামনে উন্মোচিত হয়। পরিবেশ আইন এবং তথ্যের অধিকার (RTI) আইনকে কাজে লাগিয়ে গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। যখন কোনো কলকারখানা লোকচক্ষুর অন্তরালে নদীর পানি বিষাক্ত করে বা লোকালয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া ছাড়ে, তখন গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদন প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। শুধু অপরাধী চক্র উন্মোচনই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা গণমাধ্যমের অন্যতম সামাজিক দায়িত্ব। পরিবেশ সাংবাদিকতাকে একটি বিশেষায়িত পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব, যাতে তারা কোনো ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে পরিবেশের পক্ষে সত্য তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি, টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি খাত, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিল্প মালিকদের কেবল মুনাফা অর্জনের দিকে না তাকিয়ে পরিবেশবান্ধব সবুজ ব্যবসার মডেল গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি কলকারখানায় আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল ইটিপি স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে এবং কারখানার ভেতরের বর্জ্যকে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন কাজে লাগানোর বৃত্তাকার অর্থনীতি নীতি অনুসরণ করতে হবে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা ফান্ডের একটি বড় অংশ পরিবেশ পুনরুদ্ধার, ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ বিষয়ক গবেষণায় ব্যয় করা উচিত। ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের একক আধিপত্য বন্ধ করতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে এবং পাটের তৈরি নান্দনিক ব্যাগ, কাগজের তৈরি সামগ্রী এবং পচনশীল জৈব প্লাস্টিকের উৎপাদন বাড়িয়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। অন্যদিকে, এনজিওগুলো বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার যে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তা ব্যবহার করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ধান ও সবজি চাষের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গ্রামীণ স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এনজিওগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এছাড়া, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের সাথে বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকার কঠোর আইন করুক, গণমাধ্যম সোচ্চার হোক কিংবা বেসরকারি সংস্থাগুলো নানামুখী প্রকল্প গ্রহণ করুক না কেন, দেশের ১৭ কোটি সাধারণ মানুষ যদি ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সচেতন না হয়, তবে এই দেশকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় অত্যন্ত ছোট ছোট কিছু ইতিবাচক অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক পরিবেশ রক্ষায় এক বিশাল ও বৈপ্লবিক অবদান রাখতে পারেন। বাজার করার সময় ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণ বর্জন করে চট, পাট বা কাপড়ের ব্যাগ সাথে রাখার অভ্যাস করতে হবে। ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের তৈরি কাপ, প্লেট, চামচ ও স্ট্র ব্যবহার বন্ধ করে মাটির বা কাঁচের সামগ্রী ব্যবহারের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। যত্রতত্র, রাস্তাঘাটে, খোলা ড্রেনে, পার্কের কোণায় কিংবা জলাশয়ে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল বা গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা না ফেলে সুনির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলার নাগরিক শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। সম্ভব হলে বাড়ির বর্জ্যকে পচনশীল এবং অপচনশীল—এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা উচিত, যাতে তা সহজে রিসাইকেল করা যায়। "নিজের আঙিনা নিজে পরিষ্কার রাখি, অন্তত একটি করে ফলদ ও বনজ গাছ লাগাই"—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। শহরাঞ্চলে যাদের নিজস্ব জমি নেই, তারা বাড়ির ছাদে, বারান্দায় বা ব্যালকনিতে ছাদবাগান করার মাধ্যমে শহরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনে অপ্রয়োজনে ঘরের ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার বা এসি বন্ধ রাখা, হাইড্রোলিক হর্ন বর্জন করা এবং পানির কল ছেড়ে না রেখে অপচয় রোধ করার মাধ্যমে আমরা পরোক্ষভাবে কার্বন নিঃসরণ অনেক কমিয়ে আনতে পারি। সর্বোপরি, নিজের এলাকায় কোনো খেলার মাঠ দখল, পুকুর বা জলাশয় ভরাট, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা কিংবা গাছ কাটার মতো পরিবেশবিরোধী ঘটনা ঘটলে চুপ না থেকে সামাজিকভাবে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দ্রুত প্রশাসন ও পরিবেশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব। দেশের এই সামগ্রিক উদ্বেগজনক পরিবেশ পরিস্থিতি, আইনি সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে দেশের শীর্ষস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশবিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সমাজচিন্তকদের নামবিহীন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও গভীর পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একজন শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিজ্ঞানী ও জলবায়ু গবেষকের গভীর উদ্বেগের সাথে করা মন্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ভুক্তভোগী দেশ হলেও এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও, আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও ই-বর্জ্য দূষণ রোধে নিজেদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার চরম অভাব রয়েছে। দেশের নদীগুলোর ব্যাপক দখল-দূষণ এবং বায়ুর মান যেভাবে দিন দিন নিচে নামছে, তা যদি ডেল্টা প্ল্যান ও ক্লাইমেট প্ল্যানের মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোধ করা না যায়, তবে আগামী দুই দশকের মধ্যে দেশের বড় বড় মেগাসিটিগুলো সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য ও পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে। কারণ প্রকৃতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে, নদী মেরে এবং ফুসফুসকে বিষাক্ত করে যে অর্থনৈতিক বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি আসে, তা আদতে কোনো উন্নয়ন নয়, বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মহননের পথ প্রস্তুত করা। আবার পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীর আইনি পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ সহ অত্যন্ত আধুনিক ও বিশ্বমানের চমৎকার সব আইন এবং সাংবিধানিক বিশেষ ধারা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু আমাদের মূল সংকটটি আইনের অভাব নয়, বরং তা হলো আইনের চরম প্রয়োগহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি। দেশের পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও স্বাধীন ক্ষমতার অভাবে আইন লঙ্ঘনকারী বড় বড় প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। পরিবেশ ধ্বংসের ও শব্দ দূষণের মতো মারাত্মক অপরাধকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে একে সরাসরি দেশদ্রোহিতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল মনে করা উচিত। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় সম্পূর্ণ বিবেচনা না করে, দেশের পরিবেশ আদালতগুলোকে পুরোপুরি স্বাধীন, গতিশীল ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মাধ্যমেই কেবল এই আইনি অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। একই সাথে, দেশের একজন খ্যাতনামা সমাজবিজ্ঞানী ও প্রবীণ নগর পরিকল্পনাবিদের সামাজিক ও কৌশলগত বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনকে কেবল সরকারি পরিপত্র বা গুটিকয়েক পরিবেশবাদী সংগঠনের গণ্ডি থেকে বের করে একটি সর্বাত্মক জাতীয় সামাজিক বিপ্লবে রূপান্তর করতে হবে। দেশের সাধারণ নাগরিকরা যতক্ষণ না পর্যন্ত মন থেকে ভাববেন যে এই নদী, এই বাতাস, এই গাছপালা আমার নিজের এবং আমার সন্তানের বেঁচে থাকার অবলম্বন—ততক্ষণ শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে বা জরিমানা করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে শৈশব থেকেই শিশুদের মনে প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বীজ বুনে দিতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বৃহৎ কাজে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা, এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কমিটি গঠন এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাকে আরও বেশি জবাবদিহিতা ও আর্থিক ক্ষমতার অধিকারী করাই হবে বর্তমান পরিবেশগত সংকট উত্তরণের সবচেয়ে টেকসই ও কার্যকর সামাজিক সমাধান। বলা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের জন্য কোনো বিলাসিতা, ফ্যাশন বা সখের বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের মানচিত্রে টিকে থাকার এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের যে রূঢ়, নির্মম ও ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি আজ বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, তাতে ঘরে বসে হাত গুটিয়ে অলস সময় পার করার বা একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর আর কোনো সুযোগ নেই। অপরিকল্পিত ও অতি মুনাফাকেন্দ্রীক শিল্পায়ন আর মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হতে পারে না আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নদী-নালা, পাহাড়, চিরসবুজ বনাঞ্চল আর উর্বর কৃষিজমি। দেশকে এই নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রকে যেমন আইনের এক অভেদ্য ও কঠোর বেড়াজাল তৈরি করতে হবে, গণমাধ্যমকে যেমন সবসময় সত্যের পক্ষে সোচ্চার থাকতে হবে, বেসরকারি ও করপোরেট খাতকে যেমন তাদের ব্যবসায়িক নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, ঠিক তেমনি দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিককে নিজের অবস্থান থেকে একজন সজাগ ও সক্রিয় পরিবেশ যোদ্ধার ভূমিকা পালন করতে হবে। "পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় হই, দেশকে বাঁচাই"—এই স্লোগানকে কেবল দেয়াল লিখন বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের প্রতিদিনের কর্মে, আচরণে এবং চিন্তায় প্রতিফলিত করতে হবে। তবেই আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই প্রিয় জন্মভূমিকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ, দূষণমুক্ত, পরিচ্ছন্ন এবং টেকসই সুন্দর বাংলাদেশ হিসেবে রেখে যেতে সক্ষম হব।
লেখক :সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।