প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 16, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 16, 2026 ইং
চীনের মেগা বিনিয়োগে বদলে যাবে আনোয়ারা, আসছে এক লাখ চাকরির সুযোগ

আনোয়ারায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন, সৃষ্টি হবে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থান
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (Chinese Economic and Industrial Zone) স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত এ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার ঋণ সহায়তা হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা প্রদান করবে। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সরকারি সমঝোতার ভিত্তিতে আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় এলাকাটি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত সুবিধা বহন করছে। প্রকল্পটির সূচনা হয় ২০১৪ সালে, যখন চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বেজার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন ও কারিগরি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পটির অগ্রগতি থমকে ছিল। প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি)-কে ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় কাজ এগোয়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে চীনা সরকারের মনোনয়নের ভিত্তিতে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-কে নতুন ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চূড়ান্ত ডেভেলপার চুক্তির প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে আধুনিক শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের অবকাঠামো। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, সাবস্টেশন, সঞ্চালন লাইন, জলাধার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর। বেজা জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি ও অর্থায়ন কার্যক্রম চূড়ান্ত হওয়ার পর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিল্পাঞ্চলটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় দেশই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তাঁর মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল এবং আনোয়ারা-কর্ণফুলী শিল্পবেল্টের উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ প্রবাসী নিউজ টিভি