
এম. সফিউল আজম চৌধুরী
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু একটি মানবিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া একটি জটিল সংকট। মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের কারণে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর একদিকে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ক্রমেই বাড়ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সংকটের মূল কারণের সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানা উদ্যোগ, আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির পরও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বকূটনীতির এই অচলাবস্থা আর কতদিন চলবে?
সংকটের শিকড় মিয়ানমারের বৈষম্যমূলক নীতিতে:
রোহিঙ্গা সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বৈষম্য। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ও রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ কার্যত রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক নিপীড়ন, সহিংসতা, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ধারাবাহিকতা। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেও বড় ধরনের রোহিঙ্গা ঢল নামে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এই বাস্তবতায় প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফেরত পাঠানোর বিষয় নয়। তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
মানবিক দায়িত্বের ভার বাংলাদেশের কাঁধে:
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ওপর তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় ও বনভূমিতে ব্যাপক চাপ পড়ায় পরিবেশের ওপরও তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। অন্যদিকে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, বাজারব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বার্থ ও ক্ষতিও আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাড়ছে উদ্বেগ:
রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন সংঘাত এবং একাধিক মানবিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তহবিল সংকুচিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর শিশু, নারী ও অসহায় মানুষ। তাই প্রতিবছর নতুন করে তহবিল সংগ্রহের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
কূটনৈতিক অচলাবস্থাই বড় বাধা:
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অন্যতম বড় বাধা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থও সংকট সমাধানের পথে জটিলতা তৈরি করছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সম্পর্ক, ভারতের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগসহ নানা বিষয় এই সংকটকে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এ কারণে কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। প্রয়োজন জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ।
নিরাপত্তা ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই:
দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত জীবনযাপন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে মাদক পাচার, মানব পাচার, চোরাচালান ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অপরাধ বা নিরাপত্তাঝুঁকির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ১. প্রত্যাবাসনকে কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই হতে হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য। ২. আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়াসহ আন্তর্জাতিক জবাবদিহির উদ্যোগগুলোকে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারভিত্তিক চাপ অব্যাহত রাখা জরুরি। ৩. চীন, ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে সম্পৃক্ত করা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীন ও ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উচিত তাদের বোঝানো যে রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা শুধু বাংলাদেশের স্বার্থ নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ৪. ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা মাদক, মানব পাচার, অস্ত্র ও চোরাচালানসহ সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানসিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ৫. ভাসান চরকে কার্যকরভাবে ব্যবহার ভাসান চরকে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড বজায় রেখে ব্যবহার করা গেলে কক্সবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। ৬. প্রত্যাবাসনমুখী দক্ষতা উন্নয়ন রোহিঙ্গাদের জন্য এমন শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে তাদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর কাছে সীমিত পরিসরে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো প্রয়োজন।
মানবিকতা ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি:
বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু একটি দেশের সামর্থ্যেরও সীমা রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্বকে শুধু প্রশংসা না করে এর আর্থিক ও রাজনৈতিক দায়ও ভাগ করে নেওয়া। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমারকে অবশ্যই তার নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়ে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ আরও জোরদার করা।
লেখক: এম. সফিউল আজম চৌধুরী
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম