সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ: কর্ণফুলী প্রেস ক্লাবের নিন্দা ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি
মোঃ সাইফুল ইসলাম কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং কর্ণফুলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগে গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে কর্ণফুলী প্রেস ক্লাব। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কর্ণফুলী প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব দাবি ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি নুরুল আমিন মিন্টু। সভা সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। সভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের অন্যতম দায়িত্ব হলো তথ্য অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনগণের সামনে সত্য ঘটনা তুলে ধরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সাংবাদিক যেন অযথা হয়রানি, ভয়ভীতি বা মামলার শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা জরুরি। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদই প্রকাশ করা হয়নি, তাহলে মামলা কেন?
সভায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম ও দৈনিক জনবাণীর প্রতিনিধি মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, একটি পারিবারিক অভিযোগের বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে তারা কর্ণফুলীর একটি হাসপাতালে যান। তাদের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে শুধু মামলার বাদী শাহনাজের মায়ের সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি ওই হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। মামলার বাদী শাহনাজের সঙ্গে তাদের সরাসরি দেখাও হয়নি। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের বক্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় তারা কোনো সংবাদ প্রকাশ করেননি। এমনকি কোনো সাক্ষাৎকার, ছবি বা ভিডিও ধারণও করা হয়নি। সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করিনি। বিষয়টি জানতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে শুধু বাদীর মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। পরে দুই পক্ষের বক্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় আমরা সংবাদ প্রকাশ করিনি। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তার এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেস ক্লাব নেতারা বলেন, তদন্তের আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী না করে ঘটনার প্রকৃত সত্য বের করা জরুরি। সভায় কর্ণফুলীর সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে এক কন্যাশিশু নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। প্রেস ক্লাব নেতারা বলেন, কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ উঠলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। প্রেস ক্লাবের সভাপতি নুরুল আমিন মিন্টু বলেন, সাংবাদিকেরা সত্য ঘটনা তুলে ধরতে কাজ করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিককে হয়রানি বা মামলা দিয়ে দমিয়ে রাখা উচিত নয়। সাংবাদিকদের ওপর অন্যায় হলে কর্ণফুলী প্রেস ক্লাব ভবিষ্যতেও তার প্রতিবাদ করবে।
তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলীতে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সেবার মান, চিকিৎসাব্যবস্থা, জনবল ও রোগীসেবার বিষয়গুলো নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবহেলা বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পারিবারিক অভিযোগ যাচাই করতে গিয়েই মামলা সভায় তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, শাহনাজের স্বামী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা প্রায় ৬ লাখ টাকা ও ২ ভরি স্বর্ণ আত্মসাৎ করে বাড়ি থেকে চলে গেছেন। একই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তার অনাগত সন্তান নষ্ট করার অভিযোগও করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের কাছে কিছু অভিযোগের কপিও দেন বলে সভায় জানানো হয়। পরবর্তীতে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে কর্ণফুলী প্রেস ক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম এবং দৈনিক জনবাণীর প্রতিনিধি মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন হাসপাতালে যান। তবে সাংবাদিকদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তারা কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেননি। দুই পক্ষের বক্তব্য পরিষ্কার না হওয়ায় সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন তারা। সভা থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি তদন্তে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে হয়রানি বন্ধের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় কর্ণফুলী প্রেস ক্লাব। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতিনিধি খালেদ মনছুর, সহসভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি মোহাম্মদ বদরুল হক, অর্থ ও দপ্তর সম্পাদক এবং দৈনিক ইনকিলাবের সংবাদদাতা মো. জাবেদুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের বাণীর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম, ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রবাসী টিভির প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলামসহ প্রেস ক্লাবের অন্যান্য সদস্য।