• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Photo

মেলার আড়ালে কোটি টাকার খেলা, কর্ণফুলীতে অনুমোদন ও অর্থ লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন


FavIcon
Saiful Isalm
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 30, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: মোঃ সাইফুল ইসলাম

মেলার নামে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ কর্ণফুলীতে, অনুমোদন ও মাঠ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন

মো. সাইফুল ইসলাম, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক সিডিএ আবাসিক এলাকার পূর্ব পাশে এস আলম গ্রুপের মাঠে মাসব্যাপী ‘দেশীয় পণ্য মেলা’ আয়োজনকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মেলার অনুমোদন, মাঠ ব্যবহারের বৈধতা, স্টল ও বিনোদন স্পট বরাদ্দ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইমরানের সংশ্লিষ্টতায় মেলাটি আয়োজন করা হয়েছে। তবে মেলার অনুমোদন ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ তাদের। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, কসমেটিকস, পোশাক, খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ধশতাধিক স্টল রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেলায় প্রায় ৮৮টি ‘বক্স’ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি বক্সের জন্য ৬৫ হাজার টাকা করে ভাড়া নেওয়া হলে শুধু এ খাতেই প্রায় ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায়ের হিসাব দাঁড়ায়।

এ ছাড়া ইনফ্লেটেবল স্পাইডারম্যান স্লাইড, স্লিপার ও দোলনাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক স্থাপনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বিনোদন স্পটের এক মাসের জায়গা ভাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আরও প্রায় আটটি বিনোদন স্পটের প্রতিটির ভাড়া আনুমানিক ২ লাখ টাকা হিসেবে ধরলে এ খাতেও প্রায় ১৬ লাখ টাকার লেনদেন হতে পারে। তবে একটি বিনোদন স্পটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি জানিয়েছেন, টিকিট বিক্রির ৫০ শতাংশ মেলা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।

মেলায় একটি যাদু প্রদর্শনীসহ আরও কয়েকটি বিনোদন জোন রয়েছে। প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ করলে শুধু প্রবেশ ফি থেকে দৈনিক ৫০ হাজার টাকা এবং ৩০ দিনে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায়ের হিসাব দাঁড়ায়। তবে দর্শনার্থীর প্রকৃত সংখ্যা ও মোট আয় কত, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।

স্টল, বিনোদন স্পট ও প্রবেশ ফিসহ বিভিন্ন খাতের হিসাব যোগ করলে মেলাকে ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের সম্ভাবনা দেখা যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ এটিকে কোটি টাকার কাছাকাছি বা তার বেশি লেনদেনের বিষয় বলে দাবি করছেন। তবে মেলার মোট আয়, ব্যয়, স্টলভাড়া, বিনোদন স্পটের ভাড়া এবং এসব অর্থ কে বা কারা সংগ্রহ করছেন, সে বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

স্টল নেওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ব্যবসা না হলেও নির্ধারিত ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে হবে। তবে প্রয়োজনে কিছুটা কম দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী আরও দাবি করেন, স্টলের ভাড়ার পরিমাণ প্রকাশ না করতে তাঁদের নিষেধ করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

এদিকে মেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ দিয়ে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন ক্রেতা ও স্থানীয় ব্যক্তি এ অভিযোগ করেছেন। তাঁদের আরও অভিযোগ, মেলায় কিছু পণ্যের দাম স্থানীয় বাজারের তুলনায় বেশি নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, মেলায় বিক্রি হওয়া পণ্যের মেয়াদ, খাবারে ব্যবহৃত উপকরণ এবং পণ্যের মূল্য তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মেলার কারণে মইজ্জারটেক এলাকায় মহাসড়কে যানজটের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মেলায় আসা দর্শনার্থীদের যানবাহন সড়কের পাশে রাখা, রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান বসানো এবং অতিরিক্ত মানুষের চলাচলের কারণে ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের গতি কমে যায়। এতে পথচারী ও যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মেলার অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ১০ দিনের জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এক মাসের অনুমতি নেওয়া হবে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে মেলাটি ১৬ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। আয়োজকের বক্তব্য অনুযায়ী ১০ দিনের অনুমোদন নেওয়া হয়ে থাকলে সেই মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এরপরও মেলা চলমান থাকায় পরবর্তী অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এক মাসের জন্য স্টল ও বিনোদন স্পট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের মেয়াদ কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

অনুমোদনপত্র দেখতে চাইলে আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান তা দেখার সুযোগ রয়েছে বলে জানান। পরে তাঁর মোবাইলে একটি নথি দেখানো হয়। সেখানে কোনো আবেদন বা নথি জমা দেওয়ার বিষয়টি দেখা গেলেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেছে, এমন স্পষ্ট সিল, স্বাক্ষর বা তথ্য দেখা যায়নি। অন্য কাগজপত্র দেখানোর কথা বলা হলেও সেগুলো দূর থেকে দেখানো হয়। ফলে সেগুলো কোন ধরনের অনুমোদনপত্র, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মেলার মাঠ ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যে মাঠে মেলা বসানো হয়েছে সেটির ব্যবহার, মালিকপক্ষের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

মেলার আয়োজক মোহাম্মদ ইমরানের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় নেতা বাবলু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলা নিয়ে দেওয়া এক পোস্টে ইমরানকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে উল্লেখ করে অনুমোদন ছাড়া মেলা আয়োজনের অভিযোগ তোলেন। ওই পোস্টে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-নেত্রীর সঙ্গে ইমরানের ছবি প্রকাশ করা হয়।

পরে বাবলুর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।

অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রনেতা অভিযোগ করেন, মেলা নিয়ে আপত্তি তোলার পর বাবলু সেখান থেকে ২ লাখ টাকা নিয়েছেন এবং ওই অর্থের একটি অংশ স্থানীয় কয়েকজন নেতাকেও দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাবলুর কাছ থেকেও এ অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মেলার আয়োজক মোহাম্মদ ইমরান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁর একাধিক ছবি রয়েছে। তবে কারও সঙ্গে ছবি থাকা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা ও মেলার বর্তমান কার্যক্রমের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

মেলা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অনুমোদন, মাঠ ব্যবহার, যানজট এবং পণ্য বিক্রির বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদারকি না থাকার অভিযোগ তাঁদের।

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর মোহাম্মদ বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। মেলার বিষয়টি আমার আগের ওসি সাহেব তাঁদের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি দিয়েছেন কি না, কত দিনের অনুমতি দিয়েছেন বা কীভাবে দিয়েছেন, তা আমি জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিদুয়ানুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, মেলার অনুমোদন ও মেয়াদ, মাঠ ব্যবহারের বৈধতা, স্টল ও বিনোদন স্পটের ভাড়া, প্রবেশ ফি এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, খাবারের মান, অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও মহাসড়কে যানজটের অভিযোগও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবসা ও বিনোদনের সুযোগ থাকলেও অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন, জননিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এসব বিষয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছ তদারকি থাকলে মেলা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও জবাব মিলবে।