জ্বালানি সংকটে সাগর ফাঁকা: কর্ণফুলীর ট্রলার খাতে ধস, জীবিকা হারানোর শঙ্কায় হাজারো জেলে
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাত বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদী কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলার ও বোট মালিকরা পড়েছেন চরম সংকটে। ভরা মৌসুম চললেও জ্বালানি না থাকায় অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না, আর যারা যাচ্ছে তারাও নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে লোকসান, অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো জেলে ও শ্রমিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে, যার সরাসরি ধাক্কা লেগেছে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে।
ট্রলার মালিকদের দাবি, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়াই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ফলে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ফিসারি ঘাটগুলোতে মৌসুমের ব্যস্ততা নেই; সারি সারি ট্রলার অলস পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
সাধারণত ভরা মৌসুমে একটি ট্রলার টানা ২০–২৪ দিন সাগরে অবস্থান করে মাছ আহরণ করতে পারে। কিন্তু এখন জ্বালানি সংকটে সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে ১০–১২ দিনে। এতে মাছের পরিমাণ কমে গিয়ে খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ছোট ট্রলারের জন্য প্রয়োজন: ১,০০০–২,০০০ লিটার ডিজেল
বড় ট্রলারের জন্য প্রয়োজন: ৩,০০০–৪,৫০০ লিটার ডিজেল
বর্তমানে এই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। অনেক মালিক বাধ্য হয়ে বেশি দামে কালোবাজার থেকে জ্বালানি কিনছেন।
ঘাটে দেখা গেছে, অসংখ্য মাঝি ও শ্রমিক কাজের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। গত বছরের তুলনায় এবার মাছ ধরার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নেই বললেই চলে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘ হলে পরিবার নিয়ে মানবেতর অবস্থায় পড়তে হবে।
১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, অক্টোবর মাসে ইলিশ প্রজনন মৌসুমে আরও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৪০ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকে। ফলে বাকি সীমিত সময়ের ওপরই নির্ভর করেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। সেই সময়েই যদি জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, তাহলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ট্রলার মালিক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘাটতি না থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে তারা জানান।
চট্টগ্রামের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ট্রলার নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসছে। ফলে সামগ্রিক মাছ আহরণ কমে যাচ্ছে, যা দেশের মৎস্য উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মৎস্য খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তারা বাজারে নজরদারি বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট বন্ধ এবং ট্রলার খাতকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা—এই তিনটি চাপ একসঙ্গে পড়ে কর্ণফুলী অঞ্চলের মৎস্য খাত এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু ট্রলার মালিক নয়, পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিই বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :