• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Photo

কোস্টগার্ডের জব্দ সার কি পুলিশি হেফাজত থেকেই বিক্রি? তদন্তে নতুন প্রশ্ন


FavIcon
Saiful Isalm
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 5, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: MD Saiful Islam

৯০ বস্তা বিক্রির অভিযোগ, ৫০ বস্তা ট্রাকসহ কর্ণফুলীতে জব্দ; আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি নাকি সংঘবদ্ধ যোগসাজশ, তদন্তের দাবি

মোঃ সাইফুল ইসলাম: কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
মিয়ানমারে পাচারের সময় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অভিযানে জব্দ হওয়া সরকারি আলামত হিসেবে সংরক্ষিত ৪৫০ বস্তা ডিএপি সারের একটি অংশ অবৈধভাবে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, জব্দ তালিকাভুক্ত সারের মধ্যে ৯০ বস্তা গোপনে কর্ণফুলীর জুলধা এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। পরে ওই সার মিনি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার সময় কর্ণফুলী থানা পুলিশ ট্রাকসহ ৫০ বস্তা সার জব্দ করলে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি সামনে আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা জব্দ আলামতের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে, কোস্টগার্ডের অভিযানে উদ্ধার হওয়া সরকারি আলামত কীভাবে পুলিশি হেফাজত থেকে বাইরে গেল, সেটিই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে সার জব্দ করার পর সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে গুদামে স্থানান্তর না করে কার্গো বোটেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কার্গো বোট থেকে ধাপে ধাপে সার সরিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, পতেঙ্গা থানাধীন কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর, ফাঁড়ির দ্বিতীয় কর্মকর্তা এএসআই শম্ভু নাথ এবং আনোয়ারা রাঙ্গাদিয়া ফাঁড়ি ও কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত 'ক্যাশিয়ার' কনস্টেবল আলাউদ্দিনের যোগসাজশে জব্দ করা সারের ৯০ বস্তা কর্ণফুলীর জুলধা এলাকার ব্যবসায়ী মো. মনিরের কাছে বিক্রি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, পুরো লেনদেনের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন কনস্টেবল আলাউদ্দিন। এরপর মনির একটি মিনি ট্রাকে করে সারগুলো সরিয়ে নেওয়ার সময় কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. শফি উল্লাহ জুলধা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ট্রাকসহ ৫০ বস্তা সার জব্দ করেন। এ ঘটনার পর বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় আসে। পরে কর্ণফুলী থানায় মনির ও রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মামলা হওয়ার আগে রেজাউল করিমকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ঘটনার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। কোস্টগার্ডের জব্দ করা ৪৫০ বস্তা সার গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পাহারার দায়িত্বে কারা ছিলেন? জব্দ তালিকায় উল্লেখিত সারের পরিমাণের সঙ্গে বর্তমানে সংরক্ষিত সারের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না? পাহারার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের ডিউটি রোস্টার, কার্গো বোটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি ফুটেজ, পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকের চলাচলের তথ্য এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, অভিযোগে উল্লেখিত ৯০ বস্তা সার যদি সত্যিই জব্দ আলামত থেকে বাইরে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংঘবদ্ধ যোগসাজশের ফল কি না, সেটিও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই সকাল ১০টার দিকে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ৪৫০ বস্তা (২২ হাজার ৫০০ কেজি) ডিএপি সার এবং পাচারে ব্যবহৃত একটি কার্গো বোট জব্দ করে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। একই অভিযানে ২৩ জনকে আটক করা হয় এবং এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। জব্দ অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই একই সারের একটি অংশ বিক্রির অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জব্দ আলামত থেকে কোনো অংশ সরিয়ে ফেলা বা বিক্রি করা হয়ে থাকলে তা শুধু আত্মসাৎ বা চুরির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট বা বিকৃত করার মতো গুরুতর অপরাধের বিষয়ও হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত। অভিযোগ অস্বীকার করে কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর বলেন, "সারগুলো যেভাবে জব্দ করা হয়েছিল, সেভাবেই রয়েছে। বিক্রির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ আলী বলেন, জব্দ করা সার বিক্রির অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, "প্রাথমিক তদন্তে মনির ও রেজাউল করিমের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বন্দর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, "ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জব্দ তালিকা, আলামত সংরক্ষণের নথি, পাহারার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কার্যক্রম, সিসিটিভি ফুটেজ, পরিবহন রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। অভিযোগ সত্য নাকি অন্য কোনো বাস্তবতা রয়েছে, সেটিও তখন পরিষ্কার হয়ে আসবে।