• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Photo

কর্ণফুলীতে খাল পুনঃখননে ‘নয়ছয়’, বরাদ্দের হিসাবেই গরমিল!


FavIcon
Saiful Isalm
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 16, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: মোঃ সাইফুল ইসলাম

কর্ণফুলীতে খাল  পূনঃখননের অবস্থা

মোঃ সাইফুল ইসলাম: কর্ণফুলী  (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাবে বড় ধরনের গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক মজুরি, শ্রমিক সর্দারদের বিল, পাইপ স্থাপন, বৃক্ষরোপণ ও প্রকল্পের মোট বরাদ্দ নিয়েও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি, ইউনিয়ন পরিষদ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দেওয়া তথ্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দুই প্রকল্পে মোট বরাদ্দের অঙ্ক নিয়েও প্রায় ২০ লাখ ৭ হাজার ৩৭৯ টাকার পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প দুটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শিকলবাহা খাল পুনঃখনন প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, খালটির দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার। আলী হোসেন মার্কেট থেকে শিকলবাহা জিলানি গ্যাস পাম্প পর্যন্ত এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা। নথিতে শ্রমিক মজুরি বাবদ ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা, নন-ওয়েজ খাতে ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৩ টাকা এবং শ্রমিক সর্দার ভাতা ৪ হাজার ৩০০ টাকা উল্লেখ করে মোট বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।

তবে পিআইও সুজন কান্তি দাশের দাবি, প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টাকা। নথিতে উল্লেখ করা বরাদ্দের সঙ্গে তাঁর দেওয়া তথ্যের পার্থক্য দাঁড়ায় ১১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।

পিআইওর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রকল্পটিতে প্রায় ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে মূল কাজের ব্যয় প্রায় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে ওই অর্থ ফেরতের চালান বা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

খাল পুনঃখনন কাজে শ্রমিক সর্দার হিসেবে আলী আকবর ও মোহাম্মদ জাফর কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। আলী আকবরের কাজের মূল্য নিয়েও তিন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। পিআইওর হিসাবে তাঁর কাজের মূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের তথ্য অনুযায়ী, এ অঙ্ক ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর আলী আকবর নিজে জানিয়েছেন, তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার টাকা।

অপর শ্রমিক সর্দার মোহাম্মদ জাফরের কাজের মূল্য নিয়েও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। পিআইওর দাবি, তাঁকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কাজের মূল্য ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ১১ লাখ ২৪ হাজার এবং পিআইওর মাধ্যমে আরও ২ লাখ ১২ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য রয়েছে। দুই অঙ্ক মিলিয়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ফলে পিআইওর দেওয়া হিসাবের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

প্রকল্পে ৩০টি পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে ১৮টি পাইপ স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবে এ খাতে ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে পিআইও জানিয়েছেন, এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পাইপের দাম প্রায় ৭ হাজার টাকা হলে ৩০টি পাইপের মূল্য দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। স্থাপন খরচসহ মোট ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা হওয়ার কথা। ফলে এ খাতেও প্রকৃত ব্যয় ও কাজের পরিমাণ যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রকল্পের শ্রমিক মজুরি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের নামে শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন দাবি করেছেন, তাঁরা কোনো টাকা পাননি। আবার শ্রমিক তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রকল্পে কাজই করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শ্রমিক তালিকা, হাজিরা খাতা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও মজুরি বিতরণ তালিকা পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খোয়াজনগর থেকে দোনের খাল পুনঃখনন প্রকল্পেও বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাবে গরমিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।

নথি অনুযায়ী, এ প্রকল্পে ওয়েজ কস্ট ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯ টাকা এবং নন-ওয়েজ কস্ট ৬৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা। দুই খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৩৭ টাকা। তবে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের অঙ্কে নথিভেদে পার্থক্য রয়েছে, যা যাচাই করা প্রয়োজন।

খোয়াজনগর খালের অংশের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আহমেদকে এবং খালের ব্রিজঘাট অংশের কাজ দেওয়া হয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিনকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শেখ আহমেদ বলেন, “আমি খালের খোয়াজনগর অংশে অল্প কিছু খনন কাজ করেছি। ঘণ্টা হিসেবে কাজ করেছি। আমার কাজের বিল দেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। খনন কাজে খরচ পোষাতে না পারায় আমি কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।”

সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিন বলেন, “খোয়াজনগর খালের ব্রিজঘাট অংশে ৭৭০ ফুট কাজ করেছি। কাজের মজুরি বাবদ আমাকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। খাল খননের কাজ ছাড়াও আমাকে দিয়ে অন্যান্য কাজ করানো হয়েছে। হিসাব করলে পিআইওর কাছে আমার আরও টাকা পাওনা ছিল। পরে আমি আর তা দাবি করিনি।”

পিআইও সুজন কান্তি দাশ বলেন, খোয়াজনগর থেকে দোনের খাল পর্যন্ত খননের জন্য প্রথমে প্রায় ১ কোটি ২ লাখ টাকা এবং পরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের কথা জানান। তবে সরকারি নথিতে ওয়েজ কস্ট ও নন-ওয়েজ কস্ট মিলিয়ে বরাদ্দের অঙ্ক আরও বেশি বলে উল্লেখ রয়েছে।

তিনি বলেন, “খোয়াজনগর খাল পুনঃখননে সর্বমোট খরচ হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।”

শিকলবাহা খালের পাড়ে ৩০০টি বৃক্ষের চারা রোপণের কথাও জানিয়েছেন পিআইও। এ খাতে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি চারার পেছনে গড়ে প্রায় ৮৩৩ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে এবং কেনা ও রোপণ বাবদ কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা সরেজমিন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

দুই প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে পার্থক্য, শ্রমিক সর্দারদের বিল নিয়ে ভিন্ন হিসাব, পাইপ স্থাপনের সংখ্যা ও ব্যয়ে অসঙ্গতি, শ্রমিকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ এবং বৃক্ষরোপণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রকল্প দুটির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে পিআইও সুজন কান্তি দাশ বলেন, “এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প দুটির প্রকৃত চিত্র জানতে মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, শ্রমিক তালিকা, হাজিরা খাতা, মজুরি বিতরণের তথ্য এবং সরেজমিনে খননকাজের পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয় ও সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া অর্থের হিসাব স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষার আওতায় আনা হলে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।