৪৪ বছরেও সরকারি হয়নি কর্ণফুলীর আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ, আশ্বাসেই আটকে সরকারিকরণ
Saiful Isalm
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 22, 2026 ইং
সরকারিকরণের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার দাবি সংসদ সদস্যের
মোঃ সাইফুল ইসলাম, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি কলেজের মর্যাদা পায়নি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার অন্যতম প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ। প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের দাবি দীর্ঘদিনের। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবির সঙ্গে এবার একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্থানীয় সংসদ সদস্যও কলেজটি সরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১৯৮২ সালে মরহুম আবদুল জলিল চৌধুরীর স্মরণে তাঁর একমাত্র পুত্রবধূ মরহুম নুরুন্নাহার বেগম চৌধুরীর উদ্যোগে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের দান করা প্রায় ২ দশমিক ৭৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটি সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে প্রায় ৩ দশমিক ৬ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে। এখানে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালু রয়েছে। পাশাপাশি ডিগ্রি পর্যায়ে বিএসএস ও বিবিএস কোর্স এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর ১৯৮৮ সালে কলেজটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৩ সালে এমপিওভুক্ত এবং ১৯৯৮ সালে স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যায়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে কলেজে ৩৫ জন শিক্ষক ও ১৬ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা। আধুনিক ভবন, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ ও সিসি ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে রোভার স্কাউট, যুব রেড ক্রিসেন্ট, সাংস্কৃতিক ফোরাম, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব ও বৃক্ষরোপণ ক্লাব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী উপজেলায় সরকারি কলেজ না থাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য এ প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমাতে কলেজটি সরকারি হওয়া জরুরি। সরকারিকরণ হলে শিক্ষার ব্যয় কমার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হার কমবে এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স চালুর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা। কলেজটি সরকারিকরণের জন্য অতীতেও একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের দাবি, ২০২০ ও ২০২২ সালে এ বিষয়ে তৎকালীন মন্ত্রী ডিও লেটার দিলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে কর্ণফুলী উপজেলা গঠনের পর থেকেই কলেজটি সরকারি করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সমীর রঞ্জন নাথ বলেন, কর্ণফুলীর প্রাচীনতম কলেজ হিসেবে এটি সরকারি করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় দ্রুত সরকারিকরণ হবে, এ প্রত্যাশায় শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসী অপেক্ষা করছেন। তিন রাজনৈতিক দলের সমর্থন কলেজটি সরকারিকরণের দাবিতে সরব হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিদুল ইসলাম সাহেদ বলেন, কলেজটি কর্ণফুলীর গর্ব ও ঐতিহ্যের অংশ। সরকারিকরণ হলে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামীর শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ইমাইল হক্কানী বলেন, কর্ণফুলীর শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কলেজটি জাতীয়করণ অত্যন্ত জরুরি। বিএনপি নেতা ও কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য অ্যাডভোকেট এসএম ফোরকান বলেন, প্রতিটি উপজেলায় একটি কলেজ সরকারি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও কর্ণফুলীর এই কলেজটি এখনও সরকারি হয়নি। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে দ্রুত সরকারিকরণের দাবি জানান। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য এসএম মামুন মিয়া বলেন, ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত এ কলেজটি সরকারিকরণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, কলেজটি সরকারি হলে এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি অনার্স ও ডিগ্রি পর্যায়ে নতুন বিষয় চালুর সুযোগ তৈরি হবে। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “আমি একসময় এই কলেজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তাই কলেজটির সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি চাই, কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজটি দ্রুত সরকারিকরণ করা হোক। এ বিষয়ে আমি ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আশা করছি দ্রুতই কলেজটি সরকারিকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরই মধ্যে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য একটি ভবন বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পরও সরকারি মর্যাদা না পাওয়া এই কলেজের সরকারিকরণ এখন কর্ণফুলীর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি। সংসদ সদস্যের উদ্যোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের এই দাবি এবার বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আপনার মতামত লিখুন :