জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজ কী এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন গৌরব
Saiful Isalm
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 7, 2026 ইং
এম,সফিউল আজম চৌধুরী
জাতিসংঘের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষা, যুদ্ধবিরতি কিংবা বৈশ্বিক সংকটে পরাশক্তিগুলোর দেনদরবারের চিত্র। আর এই পুরো ব্যবস্থার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে আমরা সাধারণত জাতিসংঘের মহাসচিবকে চিনে থাকি। কিন্তু এই বিশাল বিশ্বসংস্থার আরেকটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, নীতি-নির্ধাকার ও প্রতিনিধিত্বশীল পদ রয়েছে, যা বিশ্ব কূটনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে—সেটি হলো ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি’। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশন শুরুর সাথে সাথে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে একজন নতুন সভাপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আপাতদৃষ্টিতে এই পদটিকে অনেকে কেবলই আনুষ্ঠানিক মনে করলেও, বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বহুপক্ষীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে এর কাজের পরিধি, রাজনৈতিক গুরুত্ব ও কূটনৈতিক প্রভাব বহুমাত্রিক।জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদকে যদি একটি ‘বিশ্ব সংসদ’ হিসেবে তুলনা করা হয়, তবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন সেই সংসদের ‘স্পিকার’। তার প্রধান কাজ হলো সাধারণ পরিষদের নিয়মিত, বিশেষ এবং জরুরি বিশেষ অধিবেশনগুলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিউ ইয়র্কে বার্ষিক সাধারণ বিতর্কে অংশ নেন, তখন সেই উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক সভাগুলোর মূল চালকের আসনে থাকেন তিনি। সভার সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা, কোন বিষয়ের পর কোন বিষয় আলোচনা হবে অর্থাৎ এজেন্ডা নির্ধারণ, এবং আন্তর্জাতিক নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিলে কার্যপ্রণালী বিধির সঠিক ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করার চূড়ান্ত এখতিয়ার এই সভাপতির। সাধারণ পরিষদের সভাপতির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করা এবং ঐকমত্য গড়ে তোলা। বর্তমান বিশ্বে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসে, তখন উন্নত ও অনুন্নত দেশের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সভাপতি এই ‘উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন’ বা ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার দূরত্ব দূর করতে সেতু হিসেবে কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রস্তাব ও চুক্তির খসড়া তৈরির জন্য সহ-সমন্বয়কারী নিয়োগ করেন, যারা পর্দার আড়ালে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সাথে আলোচনা করে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গগুলোর মধ্যে সাধারণ পরিষদই একমাত্র স্থান যেখানে প্রতিটি দেশের ভোটের মূল্য সমান—এখানে কোনো ‘ভেটো’ পাওয়ার বা একক দেশের আধিপত্যের সুযোগ নেই। সভাপতি এই সাম্য ও আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রের প্রতীক। সভাপতির কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই, তিনি কোনো দেশের ওপর এককভাবে নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তি আরোপ করতে পারেন না। তাই সভাপতির মূল শক্তি কোনো আইনি বা শাস্তিমূলক ক্ষমতায় নয়, বরং তার গভীর কূটনৈতিক প্রভাব ও নৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যে নিহিত। তিনি যখন বিশ্বনেতাদের একটি টেবিলে বসিয়ে কোনো সংকটের সমাধান খুঁজতে বাধ্য করেন, সেটাই তার পদের আসল কার্যকারিতা। একটি দেশের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি পাওয়া অত্যন্ত গৌরব ও বিএনপি'র কূটনৈতিক সফলতার বিষয়। বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলো কখনোই এই পদের জন্য প্রার্থী হতে পারে না, যাতে ছোট-বড় সব দেশের সমান অধিকার বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে ২০২৬ সালের ১ জুন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তর আয়োজিত এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০টি দেশ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, যেখানে কোনো ভোট বাতিল বা কেউ অনুপস্থিত ছিল না। এই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটাভুটিতে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান ৯৯টি দেশের ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক জয়লাভ করেন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। অর্থাৎ, মাত্র ৮ ভোটের ব্যবধানে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই গৌরবময় অর্জনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ড. খলিলুর রহমানের এই জয়ের পর জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র এবং বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের প্রতি তাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এই অভিনন্দন কেবল একজন যোগ্য নেতার জয়কে নয়, বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ অবদান রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ইতিবাচক ভূমিকার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা ও সম্মানেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বনেতাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন প্রমাণ করে যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগেও বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি গ্রহণযোগ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে সমাদৃত। নবনির্বাচিত এই সভাপতি আগামী ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশন শুরুর দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান সভাপতি জার্মানির আনালেনা বায়েরবকের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতি সংসদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার আহ্বায়ক বিশিষ্ট ব্যাংকার মেহেরাব হোসেন খান প্রত্যাশা করেন যে, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের পথ আরও সুগম হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুতর চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা ইস্যু। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, তিনি তাঁর এই নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবেন। পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন বিশ্ব কূটনীতির একজন দক্ষ চালক। যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এই অশান্ত সময়ে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে নিরাপত্তা পরিষদ প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান ১৯৩টি দেশের কণ্ঠস্বরকে এক সুতোয় বেঁধে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। তার সভাপতিত্বে এই ৮১তম অধিবেশনে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, এসডিজি অর্জন, জলবায়ু অ্যাকশন, মানবাধিকার রক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির সুশাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের ওপর জোর দেওয়া হবে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শেষে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি তার সভাপতিত্বেই সম্পন্ন হবে, যা তার মেয়াদকালকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি কোনো executive বা নির্বাহী শাসক নন, বরং একজন বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ক, যার হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে সাম্য, বহুত্ববাদ এবং বৈশ্বিক ঐক্যের চর্চা আরও বেগবান হবে।
এম,সফিউল আজম চৌধুরী
লেখক:-সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।
আপনার মতামত লিখুন :